নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ থেকে পর্যটন, শিক্ষা ও চাকরির ভিসার আড়ালে তরুণদের ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাচার করা হচ্ছে। এজন্য ব্যবহার করা হচ্ছে সাতটি আন্তর্জাতিক রুট। এর মধ্যে মানব পাচারের নতুন কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কম্বোডিয়া ও লাওস। বাংলাদেশ থেকে প্রথমে থাইল্যান্ড এবং পরে কম্বোডিয়া বা লাওসে নেয়া হয়। সেখানে তথাকথিত ‘অনলাইন চাকরি’ বা ‘কাস্টমার সার্ভিস’ কাজের প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও অনেকে সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে আটকা পড়েন। জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণা, জুয়া কিংবা আর্থিক জালিয়াতির কাজে বাধ্য করা হয়। পালাতে চাইলে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। পাশাপাশি সমুদ্রপথে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার মাধ্যমে অসংখ্য মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। মানব পাচার নিয়ে কাজ করা পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রতিবেদনে এসব রুটের তথ্য উঠে এসেছে। সিআইডির তথ্যমতে, বিমানপথে মানব পাচারের জন্য বর্তমানে সাতটি প্রধান আন্তর্জাতিক গন্তব্য সক্রিয় রয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ইতালি, সার্বিয়া/মেসিডোনিয়া, রাশিয়া, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও কম্বোডিয়া/লাওস। এসব কর্মকাণ্ডে দেশের কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি ও ট্রাভেল এজেন্সি এবং দালাল চক্র জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযুক্ত চক্রগুলো ভুক্তভোগীদের বিভিন্ন দেশে আকর্ষণীয় বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে আকৃষ্ট করে।

এরপর পাসপোর্ট নিয়ে বৈধ কাগজপত্রের আড়ালে তাদের বিদেশে পাঠায়। প্রথমে পর্যটন, শিক্ষা বা চাকরির ভিসা সংগ্রহ করা হয়। এরপর তৃতীয় কোনো দেশে ট্রানজিট করিয়ে চূড়ান্ত গন্তব্যে নেয়া হয়, যাতে সরাসরি গন্তব্য দেশের নজরদারি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডামুখী পাচার রুটেও নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আমেরিকাগামীদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে প্রথমে ব্রাজিল, পরে মেক্সিকো হয়ে সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ আমেরিকাকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার বেড়েছে। কারণ অনেক দেশে অন-অ্যারাইভাল সুবিধা বা তুলনামূলক দুর্বল ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা পাচারকারীদের সুযোগ করে দিচ্ছে।

এছাড়া কানাডাগামী রুটে শিক্ষা ও পর্যটন ভিসা ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। বাংলাদেশ থেকে প্রথমে নেপালসহ তৃতীয় কোনো দেশে নিয়ে পরে কানাডায় পাঠানো হয়। বিদেশে স্থায়ী হওয়ার সুযোগ ও উচ্চ আয়ের চাকরির প্রলোভনে অনেকে এ ফাঁদে জড়াচ্ছেন। তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্টাডি ও ভিজিট ভিসার আড়ালে পরিচালিত এসব নেটওয়ার্ক এখন আকাশপথে মানব পাচারের অন্যতম নতুন কৌশলে পরিণত হয়েছে। সেখানে গিয়ে অনেকে অবৈধ হয়ে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হন।

মানব পাচার মামলার তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, ইতালিগামী রুটটি বর্তমানে সবচেয়ে জটিল ও দীর্ঘ রুটগুলোর একটি। বাংলাদেশ থেকে পাচারকারীরা প্রথমে নেপাল, ভারত বা শ্রীলংকা হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠায়। এরপর মিসর, তিউনিসিয়া কিংবা লিবিয়া হয়ে অবশেষে ইতালিতে পৌঁছানো হয়। সমুদ্রপথে পাড়ি দিতে গিয়ে অসংখ্য যুবককে প্রাণ হারাতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের মরুভূমি ও ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে বাধ্য করা হয়। সেখানে মৃত্যুঝুঁকিও অত্যন্ত বেশি। যাত্রাপথে একাধিক ভুয়া ট্রাভেল ডকুমেন্ট, জাল ভিসা এবং স্থানীয় দালালচক্র সক্রিয় থাকে। অস্ট্রেলিয়াগামী রুটে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়া, পরে ইন্দোনেশিয়া হয়ে সমুদ্রপথে প্রবেশের চেষ্টা করা হয়। অনেক সময় বিমানপথ ও জলপথ মিলিয়ে মিশ্র রুট ব্যবহার করা হয়। এ যাত্রায় শত শত মানুষকে ছোট নৌকা বা মাছ ধরার ট্রলারে তোলা হয়। খাবার ও নিরাপত্তার অভাবে বহু মানুষ নিখোঁজ কিংবা নিহত হন। অন্যদিকে রাশিয়াগামী রুটে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরব হয়ে রাশিয়ায় নেয়ার তথ্য দিয়েছে সিআইডি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রেরণের প্রবণতাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

আকাশপথের পাশাপাশি অনিরাপদ সমুদ্রপথে মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলেছে। জলপথে মানব পাচারের ক্ষেত্রেও দুটি বড় রুট চিহ্নিত করেছে সিআইডি। প্রথম রুটে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়া, পরে ইন্দোনেশিয়া হয়ে অস্ট্রেলিয়ায় নেয়া হয়। দ্বিতীয় রুটে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার, থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করানো হয়। এ যাত্রায় ছোট নৌযান, ট্রলার ও মাছ ধরার নৌকা ব্যবহার করা হয়। ভুক্তভোগীদের অনেক সময় সপ্তাহের পর সপ্তাহ সাগরে আটকে রাখা হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে অনিরাপদ সমুদ্রযাত্রায় নৌকাডুবি, অনাহার, মুক্তিপণের জন্য নির্যাতন এবং মৃত্যুর ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। সমুদ্রপথের পাচার সবচেয়ে নিষ্ঠুর। এখানে মানুষকে পণ্য হিসেবে পরিবহন করা হয়। অনেকে জীবিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন না। দিনের পর দিন এ পথে মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলেছে। অনেক পরিবার তার সন্তানকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছে।

সিআইডির মানব পাচার ইউনিটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে মামলা ও গ্রেফতারের সংখ্যা বেড়েছে। গত কয়েক বছরে মানব পাচার প্রতিরোধ (টিএইচবি) ইউনিট মোট ৩৪৪ আসামিকে গ্রেফতার করেছে। ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ ১২২টি মামলা তদন্তাধীন বা নথিভুক্ত হওয়ার তথ্য দেখানো হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালে ১০০ এবং ২০২৩ সালে ৮৬টি মামলা ছিল।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, বিভিন্ন আদালতে মানব পাচারের অধিকাংশ মামলার বিচার কার্যক্রম চলছে ধীরগতিতে। মামলার উপাদান, সাক্ষ্য ও তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করতে না পারায় তদন্ত কর্মকর্তারা যথাসময়ে তদন্ত শেষ করতে পারছেন না। মানব পাচার আইনে করা মামলায় ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে অভিযোগ গঠন এবং ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করার বিধান থাকলেও তদন্ত ধীর হওয়ায় বিচার সম্ভব হচ্ছে না। যে কারণে বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকছে মামলার কার্যক্রম। ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, গ্রিস, ইতালি, সাইপ্রাস, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, ইরাক, বাহরাইন ও লিবিয়ায় বাংলাদেশীদের বেশি পাচার করা হয়ে থাকে। এসব দেশে কাজের জন্য গিয়ে নানা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন রেমিট্যান্স যোদ্ধারা। প্রতারণার ফাঁদে সবকিছু হারিয়ে দেশে ফিরে আইনের আশ্রয় নেন তারা। তবে এসব মামলায় এ পর্যন্ত কোনো রিক্রুটিং এজেন্সি বা ট্রাভেল এজেন্সির মালিকের বিরুদ্ধে সাজা হওয়ার নজির নেই বললেই চলে। অর্থের বিনিময়ে আপসরফা করায় বিদ্যমান মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ বিদ্যমান আইনে সংঘবদ্ধভাবে মানব পাচারের জন্য মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও সর্বনিম্ন সাত বছরের কারাদণ্ড এবং অন্যূন ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। আইনে সাজা না হওয়ায় পরবর্তী সময়ে পাচারকারীরা অপ্রতিরোধ্য হয়ে পুনরায় মানব পাচারে জড়িত হচ্ছেন।

দায় চাপানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে মানব পাচারের মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ। তিনি বলেন, ‘মানব পাচারকারীরা সব সময় সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করে থাকে। মিথ্যে স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের নানা প্রক্রিয়ায় বিদেশে পাচার করা হয়। আকাশপথের পাশাপাশি অনেক সময় সীমান্তবর্তী অঞ্চল দিয়ে এবং সাগরপথেও মানব পাচার হয়। বেশকিছু রিক্রুটিং এজেন্সি মানব পাচারে জড়িত। মানব পাচার ক্রমবর্ধমান হারে বেড়ে চলার পেছনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটিএ) গাফিলতি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের অভিযোগগুলো তারা একে অন্যের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করে। আর এ সুযোগে পার পেয়ে যান অপরাধীরা। মানব পাচার নিয়ন্ত্রণ করতে হলে অবশ্যই যার যে দায়িত্ব সেটা সঠিকভাবে পালন করতে হবে। অনেক সময় মানব পাচার চক্রের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাও থাকে। বিপদে পড়লেই রাজনৈতিক সুবিধা নেয়। এছাড়া বিচারহীনতার একটা সংস্কৃতি তো আছে। এসব মিলিয়েই মানব পাচারের মতো অপরাধ বেড়ে চলেছে।’

মানব পাচার তদন্তসংশ্লিষ্ট সিআইডির এক কর্মকর্তা বলেন, মানব পাচার এখন আন্তঃদেশীয় অপরাধ। এককভাবে কোনো দেশের পক্ষে এটি মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। তথ্য বিনিময় ও যৌথ তদন্ত ছাড়া বড় চক্র ভাঙা কঠিন। মানব পাচারকারীরা এখন প্রযুক্তিনির্ভর ও আন্তর্জাতিকভাবে সংগঠিত। তারা ভুয়া ভিসা, প্রতারণামূলক চাকরির অফার এবং দীর্ঘ ট্রানজিট রুট ব্যবহার করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। তবে সিআইডি ও অন্যান্য সংস্থা সমন্বিতভাবে এ নেটওয়ার্ক ভাঙতে কাজ করছে। যেকোনো সন্দেহজনক বিদেশযাত্রা, অস্বাভাবিক ট্রাভেল রুট বা অনলাইনে বিদেশে চাকরির প্রস্তাব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন হতে হবে। পাচারকারীদের বিরুদ্ধে তথ্য পেলে দ্রুত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো জরুরি। অনেক সময় দেখা যায়, একই চক্র ভুয়া রিক্রুটিং এজেন্সি, ট্রাভেল এজেন্সি ও সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম ব্যবহার করছে। তাই প্রতিরোধে প্রযুক্তিগত নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান বলেন, ‘বেশকিছু মামলা তদন্ত করতে গিয়ে মানব পাচারের আন্তর্জাতিক বেশকিছু রুট চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব রুট দিয়ে নানা শ্রেণী-পেশার মানুষকে বিভিন্ন দেশে পাচার করা হচ্ছে। চিহ্নিত করা রুটগুলো নিয়ে বিস্তর কাজ চলছে। পাশাপাশি পাচারকারীদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।’

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।